Search This Blog

Saturday, July 13, 2019

স্বপ্ন

স্বপ্ন 


স্বপ্ন মানুষের একটি মানসিক অবস্থা, যাতে মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায় বিভিন্ন কাল্পনিক ঘটনা অবচেতনভাবে অনুভব করে থাকে। ঘটনাগুলি কাল্পনিক হলেও স্বপ্ন দেখার সময় সত্যি বলে মনে হয়। অধিকাংশ সময় দ্রষ্টা নিজে সেই ঘটনায় অংশগ্রহণ করছে বলে মনে করতে থাকে। অনেক সময়ই পুরনো অভিজ্ঞতার টুকরো টুকরো স্মৃতি কল্পনায় বিভিন্নভাবে জুড়ে ও পরিবর্তিত হয়ে সম্ভব অসম্ভব সব ঘটনার রূপ নেয়। স্বপ্ন সম্বন্ধে অনেক দর্শন, বিজ্ঞান, কাহিনী ইত্যাদি আছে। স্বপ্নবিজ্ঞানের ইংরেজি নাম Oneirology। কিছু স্বপ্নবিজ্ঞানীর মতে নিদ্রার যে পর্যায়ে কেবল আক্ষিগোলক দ্রুত নড়াচড়া করে কিন্তু বাকি শরীর শিথিল (সাময়িকভাবে প্রায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত) হয়ে যায় সেই REM (Rapid eye movement, দ্রুত চক্ষু আন্দোলন) দশায় মানুষ স্বপ্ন দেখে। কিন্তু এই বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে। পেটে কোনো সমস্যা থাকলে বা উল্টো পাল্টা বেশি কিছু খেলে স্বপ্নের মাত্রা বাড়তে পারে।
স্বপ্ন হল ধারাবাহিক কতগুলো ছবি ও আবেগের সমষ্টি যা ঘুমের সময় মানুষের মনের মধ্যে আসে। এগুলো কল্পনা হতে পারে, অবচেতন মনের কথা হতে পারে, বা অন্য কিছুও হতে পারে, শ্রেণীবিন্যাস করা বেশ কষ্টকর। সাধারনত মানুষ অনেক স্বপ্ন দেখে, তবে সবগুলো মনে রাখতে পারে না।স্বপ্নের অর্থ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন লোক ভিন্ন ভিন্ন মতামত পোষণ করেছে যা সময় এবং সংস্কৃতির মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়েছে। অনেকেই স্বপ্ন সম্পর্কে ফ্রয়েডীয় তত্ত্বকে সমর্থন করেন যে স্বপ্ন মূলত মানুষের গোপন আকাঙ্ক্ষা এবং আবেগগুলির বহিঃপ্রকাশ । অন্যান্য বিশিষ্ট থিওরিগুলোতে সুপারিশ করা হয়েছে যে স্বপ্ন মেমরি গঠন, সমস্যা সমাধান এবং মস্তিষ্ককে সক্রিয়করণ করতে সাহায্য করে । প্রায় ৫০০০ বছর আগে মেসোপটেমিয়ায় স্বপ্ন সম্পর্কে যে প্রাচীন রেকর্ডগুলি পাওয়া গিয়েছিল তা মূলত কাদামাটি দিয়ে তৈরি ট্যাবলেটগুলিতে নথিভুক্ত ছিল। গ্রিক এবং রোমান যুগে মানুষ বিশ্বাস করতেন যে স্বপ্নগুলি এক বা একাধিক দেবতার কাছ থেকে প্রত্যক্ষ বার্তা অথবা মৃত ব্যক্তিদের কাছ থেকে আসা বার্তা যা প্রধানত ভবিষ্যদ্বাণী হিসাবে গণ্য করা হতো । কিছু কিছু সংস্কৃতির লোক স্বপ্নের চর্চা করত স্বপ্ন চাষের উদ্দেশ্য ।
১৯০০ এর দশকের প্রথম দিকে সিগমুন্ড ফ্রয়েড মনোবিশ্লেষণের মনস্তাত্ত্বিক শৃঙ্খলা বিকাশ করেছিলেন তাছাড়া স্বপ্নের তত্ত্ব ও তাদের ব্যাখ্যা সম্পর্কে ব্যাপকভাবে লিখেছিলেন। তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা করেছিলেন গভীরতম আকাঙ্ক্ষা এবং উদ্বিগ্নতা প্রকাশের মাধ্যমকে অবলম্বন করে যা প্রায়ই দমনমূলক শৈশব স্মৃতি বা আচ্ছন্নতা সম্পর্কিত । অধিকন্তু, তিনি বিশ্বাস করতেন যে বস্তুগতভাবে তার স্বপ্নের বিষয়টি অবশ্যই যৌন উত্তেজনা মুক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। Interpretation of Dreams (1899) এর মধ্যে, ফ্রয়েড স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার জন্য একটি মানসিক কৌশলকে বিকশিত করেছিলেন এবং একটি ধারাবাহিক নির্দেশিকা দিয়েছিলেন যা আমাদের স্বপ্নে প্রদর্শিত symble এবং motifs বুঝতে সাহায্য করবে । আধুনিক যুগে স্বপ্নকে অবচেতন মনের একটি সংযোগ হিসাবে দেখা হয় । তারা স্বাভাবিক থেকে সাধারণকে এবং অত্যধিক surreal থেকে উদ্ভট এর পরিসীমা নির্ধারণ করেছেন । স্বপ্ন বিভিন্ন প্রকৃতির হতে পারে । যেমন, ভয়ঙ্কর, উত্তেজনাপূর্ণ, জাদুকর, মর্মান্তিক, সাহসিক, বা যৌন উত্তেজনা সংক্রান্ত । স্বপ্নের ঘটনাগুলি সাধারণত যিনি স্বপ্ন দেখেন তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে । ব্যতিক্রম কিছু স্বপ্ন আছে যেখানে স্বপ্নদর্শক আত্ম সচেতনতার পরিচয় দেয়। মাঝে মাঝে স্বপ্নের মাধ্যমে ব্যক্তির মধ্যে সৃজনশীল চিন্তাধারার উদ্রেক হতে পারে যার ফলে সে অনুপ্রেরণাও অনুভব করতে পারে।

চীন ইতিহাস

ড্রিমিং একটি সাধারণ শব্দ আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানদের মধ্যে চিরস্থায়ী নির্মাণের "নিরবধি সময়" হিসাবে বোঝাত যা ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীর গঠনমূলক সৃষ্টি হিসাবে বর্ণনা করা হতো ।
৩১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মেসোপটেমিয়ায় সুমেরীয়রা স্বপ্নের নিদর্শন রেখে গিয়েছিলেন। সপ্তম শতাব্দীর বিদ্বান-রাজা Assurbanipa এই প্রারম্ভিক রেকর্ডকৃত দেব-দেবতাদের কাহিনী অনুসারে স্বপ্নের প্রতি মনোযোগ দিয়েছিলেন । কাদামাটির ট্যাবলেটগুলির আর্কাইভের মধ্যে কিংবদন্তি রাজা গিলগামেশের গল্পের কিছু বিবরণ পাওয়া গিয়েছিল ।
মেসোপটেমিয়ার লোকদের বিশ্বাস ছিল যে আত্মা বা তার কিছু অংশ ঘুমন্ত ব্যক্তির শরীর থেকে বেরিয়ে আসে যা প্রকৃতপক্ষে ঐসব স্থান এবং ব্যক্তিদের মধ্যে ঘুরে বেড়ায় যা স্বপ্নদর্শীরা তাদের ঘুমের মধ্যে দেখে । কখনও কখনও স্বপ্নের দেবতারা স্বপ্নদর্শীকে বহন করতে বলে। [15] ব্যাবিলনীয়রা এবং আসিরিয়ানরা স্বপ্নকে বিভক্ত করেছিল "ভাল" যা দেবতাদের দ্বারা প্রেরিত হয়েছিল এবং "মন্দ" যা ভূতদের দ্বারা পাঠানো হয়েছিল । তারা এও বিশ্বাস করতো যে তাদের স্বপ্ন ছিল নিখুঁত এবং ভবিষ্যদ্বাণী সংবলিত ।
২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে প্রাচীন মিশরে মিশরীয়রা তাদের স্বপ্নগুলোকে প্যাপিরাসে লিখেছিল। প্রাণবন্ত এবং উল্লেখযোগ্য স্বপ্নগুলু মানুষদের কাছে আশীর্বাদ এবং বিশেষভাবে বিবেচিত ছিল। প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে স্বপ্ন দেবতাদের কাছ থেকে বার্তা নিয়ে আসার মত শব্দগুচ্ছ ছিল। তারা মনে করত যে ঐশ্বরিক সান্নিধ্য লাভের সর্বোত্তম উপায় ছিল স্বপ্ন দেখা । তাই মিশরীয়রা দেবতাদের কাছ থেকে পরামর্শ, সান্ত্বনা, বা নিরাময় পাওয়ার আশায় বিশেষ ধরনের "স্বপ্নের বিছানা" এর মধ্যে ঘুমাত ।

ক্লাসিকাল ইতিহাস:

চীনা ইতিহাসে, মানুষ আত্মার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে লিখেছিলেন, যার মধ্যে একটি স্বপ্নের রাজ্যে যাত্রার সময় শরীর থেকে মুক্তি পায় এবং অন্যটি দেহে অবস্থান করে, যদিও শুরু থেকেই এই বিশ্বাস ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা দার্শনিক ওয়াং চং (২৭- ৯৭ খ্রিস্টাব্দ) দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। ৯০০ এবং ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে লিখিত ভারতীয় পাঠ উপনিষদে স্বপ্নের দুটি অর্থের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। প্রথমটি বলে যে, স্বপ্ন হল মনের ভিতরের নিছক ইচ্ছার অভিব্যক্তি মাত্র। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ঘুমের সময় আত্মা দেহ ত্যাগ করে এবং জাগ্রত হওয়ার আগ পর্যন্ত ঐটি দ্বারা দেহ পরিচালিত হয়।
গ্রিকরা মিশরীয়দের সাথে তাদের বিশ্বাসকে এক করে নিয়েছিল, যেমন কীভাবে ভাল ও মন্দ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা যায় এবং স্বপ্নগুলোকে সন্নিবেশ করা যায়। গ্রিকের স্বপ্ন দেবতা মরফিয়াস, যারা মন্দিরগুলিতে ঘুমাতো তাদের জন্য সতর্কবাণী ও ভবিষ্যদ্বাণী পাঠিয়েছিলেন। স্বপ্নের ব্যাপারে গ্রীকদের প্রাথমিক বিশ্বাস ছিল যে, তাদের দেবতারা স্বপ্নদর্শীদের কাছে সশরীরে দেখা দিতেন, যেখানে তারা কীহোলের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করতেন, ঐশ্বরিক বার্তা দেওয়ার পর একই ভাবে তারা প্রস্থান করতেন।
পঞ্চম খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে এন্টিফন(Antiphon) স্বপ্ন নিয়ে প্রথম গ্রীক বই লিখেছিলেন। সেই শতাব্দীতে, অন্যান্য সংস্কৃতি গ্রিকদের বিশ্বাসকে প্রভাবিত ছিল যে, আত্মা ঘুমানোর সময় শরীর ছেড়ে চলে যায়। হিপোক্রেটস (৪৬৯-৩৯৯ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দ) স্বপ্ন নিয়ে একটি সহজ তত্ত্ব দিয়েছিলেন: দিনের বেলা মানুষের আত্মা স্বপ্ন সংক্রান্ত চিত্র গ্রহণ করে এবং রাতের বেলা পূর্ণাঙ্গ একটি ছবিতে রূপদান করে। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল (৩৮৪-৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) বিশ্বাস করতেন যে স্বপ্ন হল শারীরিক কার্যকলাপ। তিনি মনে করতেন স্বপ্ন রোগের বিশ্লেষণ এবং কোন ধরনের রোগ হতে পারে তার জন্য ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে। মার্কাস টুলিয়াস সিসেরো বিশ্বাস করতেন যে স্বপ্ন মূলত তাই যা স্বপ্নদর্শী দ্বারা পূর্বের দিনগুলিতে আগেই চিন্তা করা হয়েছিল। সিসেরোর Somnium Scipionis দীর্ঘ স্বপ্নের বর্ণনা দিয়েছিলেন, যা ম্যাক্রোবিয়াস তার Commentarii in Somnium Scipionis তে মন্তব্য করেছিলেন।

আব্রাহামিক ধর্মের দিক থেকে:

ইহুদীধর্মের মধ্যে স্বপ্নকে পৃথিবীর অভিজ্ঞতার অংশ বলে বিবেচিত হয়। যেমন, কোন ধরনের পাঠ গ্রহণ এবং ব্যাখ্যা করা করা যেতে পারে। এটি Talmud, Tractate Berachot ৫৫–৬০ -এ আলোচনা করা হয়েছিল।
হিব্রুরা তাদের ধর্মের সাথে স্বপ্নকে যুক্ত করেছিল, যদিও হিব্রুরা একেশ্বরবাদী ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন যে স্বপ্নগুলি একমাত্র ঈশ্বরের কাছ থেকে প্রাপ্ত ধ্বনি ছিল। এছাড়া হিব্রুরা ভাল স্বপ্ন(ঈশ্বর থেকে) এবং খারাপ স্বপ্ন (মন্দ আত্মা থেকে) এর মধ্যে পার্থক্য তৈরি করেছিলেন। হিব্রুরা অন্যান্য প্রাচীন সংস্কৃতির মত ঐশ্বরিক বানী কে ব্যাখ্যা করার জন্য স্বপ্নের সাহায্য নিতেন। উদাহরণস্বরূপ, হিব্রু ভাববাদী সেমূয়েল "শীলোর মন্দিরের মধ্যে শুয়ে ঘুমাতেন এবং প্রভুর বাক্য গ্রহণ করতেন।" বাইবেলের "Genesis" অংশে স্বপ্নগুলোর কথা উল্যেখ করা হয়েছে।
খ্রিস্টানরা বেশিরভাগই হিব্রুদের সাথে তাদের বিশ্বাস ভাগ করে নিয়েছিল। তারা মনে করতেন যে স্বপ্ন একটি অতিপ্রাকৃত চরিত্র। ওল্ড টেস্টামেন্টে ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণা সংবলিত অনেক স্বপ্নের কথা বলা হয়েছে। এই স্বপ্ন সংক্রান্ত কাহিনীগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল জ্যাকব এর স্বপ্ন যেটি পৃথিবী থেকে স্বর্গ পর্যন্ত বিস্তৃত। অনেক খ্রিস্টান প্রচার করেন যে ঈশ্বর স্বপ্নের মাধ্যমে মানুষের সাথে কথা বলতে পারেন।
"Iain R. Edgar" ইসলামে স্বপ্নের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করেছেন । তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, স্বপ্ন ইসলামের ইতিহাস এবং মুসলমানদের জীবনযাত্রার উপর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, কারণ স্বপ্নের ব্যাখ্যা হচ্ছে একমাত্র উপায় যা মুসলমানরা শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর কাছ থেকে যে প্রত্যাদেশ লাভ করতেন তা থেকে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়।
হিন্দুধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে:
"Mandukya Upanishad" ভারতীয় হিন্দুধর্মের বেদ ধর্মগ্রন্থের একটি অংশ, এখানে স্বপ্নের তিনটি অবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম অবস্থা হচ্ছে আত্মা তার জীবদ্দশায় অভিজ্ঞতা লাভ করে। অন্য দুইটি অবস্থা হচ্ছে জাগ্রত অবস্থা এবং ঘুমন্ত অবস্থা।
ক্লাসিকাল উত্তর এবং মধ্যযুগীয় ইতিহাস:
কিছু আদিবাসী আমেরিকান উপজাতি এবং মেক্সিকান সভ্যতার লোকেরা বিশ্বাস করত যে, স্বপ্ন হল একটি উপায় যার মাধ্যমে তারা তাদের পূর্বপুরুষদের দেখতে এবং তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। কয়েকটি আদি আমেরিকান উপজাতি স্বপ্নের মাধ্যমে উপদেশ গ্রহণ না করা পর্যন্ত উপবাস ও প্রার্থনা করে। স্বপ্ন থেকে প্রাপ্ত উপদেশ তারা বাকিদের সাথে শেয়ার করে।
মধ্যযুগে স্বপ্নকে একটি কঠোর ব্যাখ্যায় উন্নীত করা হয়েছিল। তাছাড়া স্বপ্নের ইমেজ গুলোকে শয়তান এর প্রলোভন হিসাবে মনে করা হত। অনেকে বিশ্বাস করতেন যে, ঘুমের সময় শয়তান মানুষের মনকে কলুষিত ও ক্ষতিকারক চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত করতে পারে। প্রোটেস্টান্টিজম এর প্রতিষ্ঠাতা "মার্টিন লুথার" বিশ্বাস করতেন স্বপ্ন হল শয়তানের কাজ। যাইহোক, ক্যাথলিকদের মধ্যে প্রধান, যেমন সেন্ট আগস্টাইন এবং সেন্ট জেরোম দাবি করেন যে তাদের জীবনের দিকগুলি তাদের স্বপ্ন দ্বারা প্রভাবিত ছিল।

সাধারণ ব্যাখ্যা:

স্বপ্ন ব্যাখ্যাকে মূলত ব্যক্তিত্বমূলক ধারণা এবং অভিজ্ঞতার ফলাফল হিসাবে ধারণা করা যেতে পারে । এক গবেষণায় দেখা গেছে যে অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করে যে "তাদের স্বপ্নগুলি অর্থপূর্ণ এবং লুক্কায়িত সত্য প্রকাশ করে"। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যে ৭৪% ভারতীয়, দক্ষিণ কোরিয়ানদের ৬৫% এবং ৫৬% আমেরিকানরা তাদের স্বপ্নের বিষয়বস্তুকে অবচেতন মনের বিশ্বাস এবং অপূরণ আকাঙ্ক্ষার সাথে তুলনা করেছে । স্বপ্নচারণের এই ফ্রয়েডিয়ান দৃশ্যে স্মৃতির একত্রীকরণ, সমস্যা সমাধান বা মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপের বৈশিষ্ট্যের উপর বেশি অনুমোদন দেয়া হয়েছিল।

উপ শাখা:

দিবাস্বপ্ন(Day Dreaming) :

দিবাস্বপ্ন এক ধরনের ফ্যান্টাসি, সুখ, আনন্দদায়ক চিন্তা, এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রত্যাশা যা স্বপ্নদর্শী জাগ্রত অবস্থায় দেখতে পায়। বিভিন্ন ধরনের দিবাস্বপ্ন রয়েছে। এ সম্পরকে মনোবৈজ্ঞানিকদের মধ্যে কোন সঙ্গতিপূর্ণ সংজ্ঞা নেই। সাধারণ জনগণ এছাড়াও বিস্তৃত অভিজ্ঞতার এই শব্দটি ব্যবহার করে। হার্ভার্ড মনোবিজ্ঞানী ডিরড্রি ব্যারেটের গবেষণায় দেখা গেছে যে যারা নিখুঁত স্বপ্নের মতো মানসিক অবস্থায় উপনীত হতে পারে তাদের ব্যাখ্যা অনেক কার্যকর। অন্যদিকে, অনেকে মৃদু চিত্রাবলী, বাস্তবিক ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, অতীতের স্মৃতিগুলির পর্যালোচনা বা "স্পেসিং আউট" যেমন একজনের মন আপেক্ষিভাবে ফাঁকা হয়ে যায় - তখন তারা দিবাস্বপ্নের কথা বলে।
দিবাস্বপ্নকে একটি অলসতা, অ-উৎপাদনশীল চিত্তাকর্ষক হিসাবে মনে করা হয়, এটি এখন সাধারণভাবে স্বীকার করা হয় যে ডেড্রিমিং কিছু প্রসঙ্গে গঠনমূলক হতে পারে। এমন উদারণ আছে যেমন সৃষ্টিশীল লেখক, ঔপন্যাসিক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতারা দিবাস্বপ্নের মাধ্যমে অনেক সৃজনশীল বা শৈল্পিক কাজ করেছেন। একইভাবে, দিবাস্বপ্ন দ্বারা গবেষণা বিজ্ঞানী, গণিতবিদ এবং পদার্থবিজ্ঞানীরা তাদের নিজস্ব বিষয়ে নতুন নতুন ধারণা গড়ে তুলেছেন।

অমূলপ্রত্যক্ষ(Hallucination):

হেলুসিনেশন শব্দটি বিস্তৃত অর্থে ব্যবহৃত হয়, যা উদ্দীপক অবস্থার অনুপস্থিতি হলেই একে উপলব্ধি করা যায়। একটি দৃঢ় অর্থে হেলুসিনেশন হচ্ছে সচেতন এবং জাগ্রত অবস্থার অনুভূতি। তাছাড়া তার মধ্য বহিরাগত উদ্দীপনার অনুপস্থিতি এবং বাস্তব ধারণা সংক্রান্ত গুণাবলীর উপস্থিতি রয়েছে। যেগুলি উজ্জ্বল, এবং বাহ্যিক স্থানে লক্ষ্য করা যায়। পরের সংজ্ঞাটি স্বপ্নচারণ সম্পর্কিত ঘটনা থেকে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে, যা জাগ্রত অবস্থার জড়িত নয়।
দুঃস্বপ্ন(Nightmare):
দুঃস্বপ্ন একটি অপ্রীতিকর স্বপ্ন যা মন থেকে একটি শক্তিশালী নেতিবাচক মানসিক প্রতিক্রিয়া হতে জন্ম নিতে পারে। সাধারণত ভয় অথবা ভয়াবহ এমনকি হতাশা, উদ্বেগ, দুঃখ থেকেও মানুষ দুঃস্বপ্ন দেখতে পারে। স্বপ্নে বিপদ, অস্বস্তি, মানসিক বা শারীরিক অসুস্থতার উপস্থিতি থাকতে পারে। ভুক্তভোগী জাগ্রত অবস্থায় মানসিক দুঃশ্চিন্তার মধ্যে থাকে এবং দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমাতে পারে না।
রাতের আশঙ্কা(Night terror):
এটি মূলত ভালো ঘুমের বিপরিত হিসাবে পরিচিত। এটি এক ধরনের প্যারাসোমনিয়া ডিসঅর্ডার যা প্রধানত শিশুদের প্রভাবিত করে এর কারণে তারা ভয় পায়। রাতের আশঙ্কাকে দুঃস্বপ্নের সঙ্গে এক করা উচিত নয়, যা ভয়ঙ্কর ভয় বা অনুভূতি কারণে ঘটে থাকে।

গবেষণা

১৯৪০-এর দশক থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ক্যালভিন এস হল পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি স্বপ্ন সম্বন্ধীয় প্রতিবেদন সংগ্রহ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইয়োতে অবস্থিত কেইস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটিতে পেশ করেন। ১৯৬৬ সালে হল এবং ভ্যান দ্য ক্যাসল দ্য কন্টেন্ট এনালাইসিস অফ ড্রিমস নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। গ্রন্থে তাঁরা কোডিং পদ্ধতির মাধ্যমে এক হাজার কলেজ ছাত্রের স্বপ্নের প্রতিবেদন তুলে ধরেছেন। সেখানে তাঁরা দেখিয়েছেন যে, সমগ্র বিশ্বের জনগণ সাধারণত একই ধরনের বিষয় নিয়ে স্বপ্ন দেখে। হলের পূর্ণাঙ্গ স্বপ্ন সংবলিত প্রতিবেদন ১৯৯০ এর মাঝামাঝি সময়ে তার উত্তরসূরী উইলিয়াম ডোমহফ কর্তৃক জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়। সেখানে আরও ভিন্ন বিশ্লেষণ দেখা যায়। স্বপ্নে মানুষ অধিকাংশ সময়ই গত দিন বা গত সপ্তাহের বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কিত কিছু দেখে।

জৈবিক ধারা

ক্যালভিন হলের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, যৌবনে মানুষের মোট স্বপ্নের ১০ শতাংশের বেশি যৌন বিষয়ে হয় না। আরেকটি গবেষণায় দেখা যায় যে, ৮% নর-নারী যৌন স্বপ্ন দেখে থাকেন।কিছু কিছু ক্ষেত্রে যৌন স্বপ্নের ফলে বীর্যপাত ঘটে। সচরাচর তা ভেজা স্বপ্ন বা স্বপ্নদোষ নামে পরিচিতি হয়।

কার্যকারিতা

স্বপ্নের কার্যকারিতা নিয়ে অনেক অনুকল্পকে প্রস্তাব করা হয়েছে, এগুলোর কোনকোনটি পরবর্তী সময়ের অভিজ্ঞতামূলক গবেষণার সাথে বিরোধী বলে প্রমাণিত হয়। এটাও প্রস্তাব করা হয়েছে যে স্বপ্নের কোন নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নেই, এবং স্বপ্ন কেবল ঘুমের সময় মস্তিষ্কে জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফলাফল।

গতিবাদী মনোরোগবিদ্যা

ফ্রয়েডের দৃষ্টিভঙ্গি

১৯ শতকের শেষের দিকে, মনোচিকিৎসক সিগমুন্ড ফ্রয়েড একটি তত্ত্ব তৈরি করেন যে, অচেতন ইচ্ছাপুরণের দ্বারা আমাদের স্বপ্নের বিষয়বস্তু তাড়িত হয়। ফ্রয়েড স্বপ্নকে "অচেতনের দিকে রাজকীয় পথ" হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি তত্ত্বায়ন করেন, স্বপ্নের বিষয়বস্তুগুলো স্বপ্নদ্রষ্টার অচেতন মন এর প্রতিফলন ঘটায়, এবং বিশেষ করে স্বপ্নের বিষয়বস্তু অচেতন ইচ্ছাপুরণের দ্বারা আকৃতিপ্রাপ্ত হয়। তিনি যুক্তি দেন যে, গুরুত্বপূর্ণ অচেতন ইচ্ছাগুলো প্রায়ই প্রাথমিক শৈশবকালের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্কিত হয়। ফ্রয়েডের তত্ত্ব স্বপ্নকে প্রকাশিত ও সুপ্ত উভয় হিসেবেই বর্ণনা করে। সুপ্ত বিষয়বস্তু গভীর অচেতন ইচ্ছা এবং কল্পনার সাথে সম্পর্কিত এবং প্রকাশিত বিষয়বস্তু উপরিউপরি ও অর্থহীন।
প্রকাশিত বিষয়বস্তু অনেক সময় সুপ্ত বিষয়বস্তুকে আড়াল বা অস্পষ্ট করে।
সিগমুন্ড ফ্রয়েড তার প্রথম দিকের কাজগুলোতে লিখেছেন, সুপ্ত স্বপ্নের বিশাল অংশ যৌনতার সাথে সম্পর্কিত, কিন্তু পরবর্তিতে তিনি তার এই অবস্থান থেকে সরে আসেন। তিনি তার বিয়ন্ড দ্য প্লিজার প্রিন্সিপল গ্রন্থে উল্লেখ করেন, কিভাবে মানসিক আঘাত বা ট্রমা বা সহিংসতা স্বপ্নের বিষয়বস্তুকে প্রভাবিত করতে পারে। তিনি তার ড্রিমস এন্ড অকাল্টিজম বক্তৃতায় স্বপ্নের অতিপ্রাকৃত উৎস্য সম্পর্কে আলোচনা করেন। বক্তৃতাটি নিউ ইন্ট্রোডাকটরি লেকচারস অন সাইকোএনালাইসিস - এ প্রকাশিত হয়।
পরবর্তী জীবনে ফ্রয়েড স্বীকার করেন যে, স্বপ্নকে "ইচ্ছা পুরণ হিসেবে শ্রেণীভূক্ত করা সম্ভব নয়"। বারবার দুঃস্বপ্নের সাথে পোস্ট ট্রমেটিক স্ট্রেস ডিজর্ডার এর সম্পর্ক আছে। আধুনিক পরীক্ষামূলক গবেষণা স্বপ্ন নিয়ে ফ্রয়েডের অনেক তত্ত্বের বিরুদ্ধে গেছে। ফ্রয়েডের "ড্রিম-ওয়ার্ক" ব্যাখ্যা-কৌশল এর কোন অভিজ্ঞতামূলক বৈধতা পাওয়া যায় নি।

ইয়ং এর দৃষ্টিভঙ্গি

কার্ল ইয়ং ফ্রয়েডের অনেক তত্ত্বই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ইয়ং ফ্রয়েডের স্বপ্ন নিয়ে ধারণাটি সম্প্রসারিত করেন, এবং এটাকে স্বপ্নদ্রষ্ঠার অচেতন আকাঙ্ক্ষার সাথে সম্পর্কিত করেন। তিনি স্বপনকে স্বপ্নদ্রষ্টার কাছে আসা বার্তা হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন স্বপ্নদ্রষ্টাদেরকে তাদের নিজেদের ভালর জন্যই তাদের স্বপ্নের প্রতি মনোযোগ দেয়া উচিৎ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, স্বপ্ন স্বপ্নদ্রষ্টার কাছে সেইসব সত্যকে প্রকাশ করে, যা তার ভয়ের আবেগীয় ও ধর্মীয় সমস্যার সমাধান করতে সাহায্য করতে পারে।
ইয়ং লেখেন যে, পৌনঃপুনিক স্বপ্নগুলো বারবার আসে বলে এটিতে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। এটি নির্দেশ করছে যে স্বপ্নদ্রষ্টা তার স্বপ্নের সাথে জড়িত সমস্যাকে অবহেলা করছেন। তিনি একে "ক্ষতিপূরণ" হিসেবে আখ্যায়িত করেন। স্বপ্ন সচেতন বিশ্বাস এবং প্রবণতাগুলোকে এগুলোর বিকল্পের সাথে ভারসাম্যে স্থাপন করেন। ইয়ং বিশ্বাস করতেন না যে, সচেতন প্রবণতাগুলো ভুল এবং স্বপ্নই সত্যকারের বিশ্বাস দান করে। তিনি বলেন, স্বপ্ন নিয়ে করা ভাল কাজের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন। তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বপ্নের অনেক চিহ্নই প্রতিটি স্বপ্নেই ফিরে আসে। ইয়ং বিশ্বাস করতেন, কোন দিনে তৈরি হওয়া স্মৃতিরও স্বপ্নে ভূমিকা রাখে। এই স্মৃতিগুলো আমাদের উপর কিছু ছাপ রেখে যায় যাতে আমাদের অচেতন মন এগুলো নিয়ে কাজ করতে পারে যখন ইগো কাজ করে না। অচেতন মন অতীতের এই ছাপগুলোকে স্বপ্নের আকারে আবার কার্যকরী করে। ইয়ং একে দিবা অবশিষ্টাংশ (day residue) বলে উল্লেখ করেছেন।ইয়ং এও বলেছেন, স্বপ্ন পরিপূর্ণ ব্যক্তিক উদ্বিগ্নতা নয়, সব স্বপ্নই একটি "মনোবৈজ্ঞানিক নিয়ামকগুলোর একটি বৃহৎ জালিকার" অংশ।

ফ্রিৎজ পার্লস এর দৃষ্টিভঙ্গি

ফ্রিৎজ পার্লস গেস্টাল্ট থেরাপি এর পূর্ণাঙ্গ প্রকৃতির একটি অংশ হিসেবে তার স্বপ্ন নিয়ে তত্ত্ব তৈরি করেন। স্বপ্নকে এখানে আত্ম (self) এর একটি আকার হিসেবে দেখা হয় যাকে অবহেলা, প্রত্যাখ্যান করা হয় বা দাবিয়ে রাখা হয়। ইয়ং বলেন, একজন ব্যক্তি তার স্বপ্নে নিজের পরিপ্রেক্ষিত থেকে যেকোন ব্যক্তিকেই বিবেচনা করতে পারেন, যাকে স্বপ্নের বিষয়ীগত বা ব্যক্তিবাচক অভিমুখ বলা হয়। পার্লস এই মতকে সম্প্রসারিত করে বলেন, এমনকি প্রাণহীন বস্তুও স্বপ্নদ্রষ্টার দৃষ্টিভঙ্গি বা পরিপ্রেক্ষিতের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, কারণ এটিও বিষয়ীগত। স্বপ্নদ্রষ্টাকে তাই তার স্বপ্নে নিজেকে একটি বস্তু হিসেবে কল্পনা করতে এবং একে বর্ণনা করতে বলা যেতে পারে, যাতে স্বপ্নদ্রষ্টার ব্যক্তিত্বের সাথে বস্তুটির বৈশিষ্ট্য এর মধ্যকার মিথস্কিয়া সম্পর্কিত সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে।

No comments:

Post a Comment

শ্মশানের ভূত

  দ্বিতীয় পর্ব     জ্ঞান ফিরল পরদিন সকাল নটায়। ততক্ষণে ঠাকুরমশাই বাড়ির পুজো করে ফেলেছেন।       বাড়ির সবাই আমাকে চা...