Search This Blog

Friday, October 11, 2019

ঘড়া ” একটি জ্বীন এর গল্প ( পর্ব ৬ )

https://bdpraorg.blogspot.comআধা ঘন্টা পর বের হয়ে ডাইনিংয়ের এক কোণায় বসে রয়েছি, আর ভাবছি আর কত রাত না ঘুমিয়ে কাটাবো!
মানিক জোড়ের মত আবিদ আর দোউখানুর উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ তুলে তাকিয়েছি । বুকটা ঢিপ ঢিপ করছে । মাথাটা ঠান্ডা হলেও, মুখটা বেশ গরম হয়ে উঠছে মনে হচ্ছে । মনে পড়ল ব্লাড প্রেশারের ট্যাবলেটটা খেতে ভুলে গিয়েছি। আমি ওদেরকে হাতের ইশারায় একটু অপেক্ষা করতে বলে ,একটু উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই আবিদ বলল, ‘ তুমি বস, আমি নিয়ে আসছি । ‘ দোউখানু ‘ ভাই আমার, পানি নিয়ে এসো । ‘ ট্যাবলেট আর পানি নিমেষে হাজির । খেয়ে ফেললাম তাড়াতাড়ি ।
তোমাদের দু’জনের বক্তব্য কি এক? ‘
দুই জনেই সমস্বরে বলে উঠল, ‘ না ‘
– ‘ ঠিক আছে, কে বলবে আগে ?’ আবিদ বলল, ‘আমি বলব, কারণ আমার বক্তব্য বেশ ছোট, আর দোউখানুর বক্তব্য শুনলে তোমার নার্ভ রিলাক্সেনের প্রয়োজন পড়তে পারে । ‘
– ঠিক আছে তোমার বক্তব্য পেশ করতে পার! ‘
-‘আমার সমস্যা এই এ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং সংক্রাণ্ত। গত ছয় মাস ধরে একজন ফ্ল্যাট এর উন্মাদ মালিক চরম বিশৃংখলা সৃষ্টি করছে । এবাড়ির কমন এবং ব্যাক্তিগত কর্মচারীদের ভীষণ ভাবে অপদস্থ করছে এমনকি মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে । এমন কি বাবার পরিচালনা সংক্রান্ত যোগ্যতা সমন্ধেও বিরুপ উক্তি প্রকাশ করেছে । আমি খুব অপমানিত বোধ করছি! পেশায় উনি প্রকৌশলী হলেও, উনি প্রশাসনের সাথেই যুক্ত। আর চোরের মায়ের বড় গলার মত আমাদেরই বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করছে । গতকাল উন্মাদ আমাদের গ্যারাজ দখল করেছে । অথচ মূল সম্পত্তির মালিক আমার বাবা। উন্মাদ লোকটা কথায় কথায় ‘ দুই টাকার লোক্ִ’ বলে সবাইকে সম্মোধন করে। ব্যাপারটা গ্রহণ যোগ্য নয়! আজ সন্ধ্যায় দোউখানুকে ধরেছিল । দোউখানু চুপ চাপ লোকটাকে দু’মিনিট শূন্যে ঝুলিয়ে রেখেছিল । আমি একটা পোষ্টার ফেলতে চাই! অগ্নি দৃষ্টি হানলাম দোউখানুর দিকে।
-‘দোউখানু তোমাকে বলেছি না এ ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকতে! ‘
-‘আবিদ, যা করবে,বুঝে শুনে করবে। আমি সমস্যাটা হালকা ভাবে শেষ করতে চাই । এবার দোউখানু বল। ‘
-‘আমি তাসনিয়া জাফর আর ব্লু স্কাইয়ের বাড়িতেও গিয়েছিলাম! ‘
-‘ সিলেকশন কার ছিল? ‘
– ‘ আবিদ ভাইয়ের ‘
– ‘ প্রথমে আমি তাসনিয়া জাফরের বাসায় গেলাম, দেখলাম একটা থালায় মানুষের গুর্দা সাজানো আর উনি ধ্যান মগ্ন হয়ে সামনে বসে আছেন, তবে বড়ই রূপবতী! প্রথমে ভেবেছিলাম উনি গুর্দাটা খাবেন, ভয়ে চলে আসছিলাম কিন্তু তারপর দেখলাম উনি গুর্দাটা দেখছেন আর কাগজে কিছু লিখছেন । সামনে একটা বইও খোলা । বুঝ্লাম উনি চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে লেখা পড়া করছেন । বড়ই একিনিষ্ঠ । ‘
– ‘ তারপর? ‘
-‘আমি ব্লু স্কাইয়ের কাছে যেতে চাই নাই, কিন্তু আবিদ ভাই বললেন ‘
-‘বেশ রোডিস রোডিস মনে হচ্ছে। দোউখানু আমিও যাব তোমার সাথে। কি আর করব ,আবিদ ভাইকে পিঠে নিয়ে রওয়ানা দিলাম।গিয়ে দেখি, উনি ওনার বাইকটা ঘসে মেজে চকচকে করলেন, তারপর টেস্ট রানের জন্য রাস্তায় নেমে এলেন। কত রকমের কসরত যে উনি দেখালেন!
আবিদ ভাই বললেন ‘কুল ‘।
তারপর বাসায় ফিরে এলাম।’
চোখ ছানা বড়া করে আবিদের দিকে তাকিয়ে আছি।
-‘মা, আগামিকাল আমি দোউখানুর সাথে বিশ্ব ভ্রমণে যেতে চাই।’
-‘কোনো মতেই না, রাতের বেলা গিয়েছো মেনে নিলাম, কেউ দেখেনি, কিন্তু দিনের বেলা একটা মানুষ উড়ে যাচ্ছে, সারা বিশ্বে তোলপাড় হয়ে যাবে!
আচ্ছা ফেসবুক অধ্যায় এখন ক্লোজড। টাকার জোগাড়ের কথা ভাবো!’
-‘কত কম পড়েছে তোমার?’
-‘চার লাখ’
-‘হু, বাবা এত দিতে গাই গুই করতেই পারে!’
-‘ম্যাডাম, আমি টাকা চিনি । আমার হতে পারত সন্দেশজাদী শাশুড়ী আম্মার আমলে দেখেছি। সব চাইতে বড় একটা টাকা আমাকে দেখাতে পারবেন? আর কত গুলো টাকা লাগবে? মানে সংখায় কত গুলো? ‘
একটা এক হাজারী নোট এনে দেখালাম। নিমেষে উধাও হয়ে গেল দোউখানু। মিনিট দশেকের মধ্যে ফিরে এসেছে, হাতে এক গাদা টাকা!
-‘দেখুন তো সন্দেশ আম্মু, এতে হবে কিনা?’
কয়েকটা টাকা হাতে নিলাম, দেখি দোউখানুর ছবি সাটানো নোটগুলোয়!
-‘সব তৈরী করতে পেরেছি , কিন্তু চেহারাটা কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না! তাই নিজের চেহারাটা ছেপে দিয়েছি!’
আমি আর আবিদ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছি!
-‘দোউখানু ভাই, বাবার বন্দুক থেকে সাবধান! এই বাড়িতে ফর্জারী!
তুমি তো মরবে না বন্ধু, কিন্তু আমার আর মাকে মরতেই হবে! নিশানা একদম পাকা! এখন পর্যন্ত একটা টার্গেটও মিস হয় নাই!’
আমরা তিনজনেই নিরুপায় হয়ে বসে আছি!
আবিদ বলল, ‘ঠিক আছে, আমি দু’লাখ দিতে পারব তবে একটা শর্ত আছে। ‘
-‘তুই দিবি কোথা থেকে? ‘
-‘ ছুটা কাজ করে রোজগার করেছি, সৎ উপার্জন ।’
-‘কি শর্ত বাবা? ‘
কিছ্ক্ষণ পর আবিদ বলল,’ -‘শর্ত হল, খাবারগুলো তৈরীর পর দোউখানুকে উধাও হয়ে যেতে হবে। ডিনারের সময় ও অন্য বেশে ফিরে আসবে, আমার অতিথি হয়ে।’
-‘ঠিক আছে বাবা, কিন্তু কেন?’
-‘কারণ দোউখানু আমার বন্ধু তাই।’
-‘ঠিক আছে, ঠিক আছে! বাকিটা আমি তোর বাবার কাছ থেকে ম্যানেজ করে নেব।’
-‘দোউখানুর বয়স হবে পয়্ঁত্রিশ। দেখতে হবে জর্জ ক্লুনির মত। ‘
-‘চেহারাটা একবার দেখালেই হবে, আর কাপড় জামার ধরনটা দেখিয়ে দিলেই হবে। আম্মা, আমি এখন বেরিয়ে পড়ি, সকাল হয়ে এল প্রায়, নাহলে ফিরতে দেরি হয়ে যাবে।’
-‘হু, তুমি রওয়ানা হয়ে যাও দোউখানু আর আমারও বের হতে হবে। তোমার সাথে আরও কথা আছে দোউখানু। পরে বলব।’
-‘জ্বি ম্যাডাম।
একটু প্রসন্ন বোধ করলাম। ‘ম্যাডাম’ ডাকটা অভ্যাস হয়ে যাবে মনে হচ্ছে । যাই বেরিয়ে পড়ি শাহজাদী বিলকিস বেগমের খোঁজে।
সকাল নয়টার মধ্যে বিলকিস বেগমের তৈলচিত্র লাগানো হয়ে গিয়েছে। ফৌজী তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছে। মতিবিবি গৃহকর্তার পিছনে উকি ঝুকি মেরে দেখছে।
-‘ইয়া আল্লাহ! এটা তো আমি মিডাম!
গৃহকর্তার গম্ভীর ধমক শুনতে পেলাম।
-‘মতিবিবি! ছবিটাকে অপমান করছো তুমি!’
এদিকে ঘড়ির কাঁটা সাড়ে দশ ছুইঁ ছুইঁ। কাঁটায় কাঁটা সাড়ে নয়টায় বেরিয়ে যাওয়ার কথা । দোউখানুর ফিরে আসার সময় হয়ে গেল। এই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে দোউখানু কত ঘন্টা কাটাবে কে জানে!
-‘তোমার কি অফিসে যেতে আজ দেরি হবে?’
-‘না, আজ আসলে বিশেষ কাজ নেই। ভাবছি আজ লাঞ্চের পরই যাব।’
আর কত দিক সামাল দেই আমি!
-‘কিন্তু আজ যে আমি ভেবেছিলাম তোমার সাথে বাইরে লাঞ্চ করবো।’
-‘ওহ! ঠিক আছে তাহলে। আমি চলে যাই অফিস, তুমি লাঞ্চে চলে এসো।’
পা চলে কি চলে না, যেন অনিচ্ছায় বেরিয়ে গেলেন উনি।
ঠিক বারোটায় দোউখানু ফিরে এল। হাতের জিনিস গুলো রেখে আমার কাছে আসার পথে চোখে পড়ল ছবিটা। থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে দোউখানু। পনের মিনিট সময় দিলাম আমি দোউখানুকে । তারপর খুব কোমল স্বরে ডাকলাম, ‘পাকু মিয়া,একটু এদিকে এসো।’
জলভরা চোখে দোউখানু আমার দিকে ফিরে তাকালো। ধীর পায়ে আমার কাছে এগিয়ে এলো।
-‘ছবিটা তোমার জন্য দোউখানু! আমার বাবার বাড়িতে ছিল। আজ সকালে এনেছি।’
হে সৃষ্টিকর্তা, শঠতার জন্য আমাকে ক্ষমা কর!
-‘দোউখানু, তুমি তোমার আনাজ পাতি সামলাও মতিবিবির হাত থেকে । বিলকিস বেগমকে দেখার জন্য তো সারা রাত পড়ে রয়েছে । কাল দাওয়াত, তোমার অনেক কাজ আর মতি বিবির কোমরের ব্যাথাটাও বাড়িয়ে তোলা প্রয়োজন।’
-‘আপনি ঠিক বলেছেন ম্যাডাম, কর্তব্য আগে।’ ধরা গলায় দোউখানু জবাব দিল।
-‘ওহ, তোমাকে বলে নেই, প্রথম দাওয়াতে আমার আত্মীয় স্বজনেরা আসবেন। আমেরিকা থেকে আমার ছোট ভাই ও তার পরিবার এসেছে, আমার বড় বোন ও তার পরিবার আমার আর একজন ভাই যিনি জ্বিন হুজুর নামে পরিচিত, আমার শাশুড়ী, আমার ফুপু শাশুড়ী,ফুপু শাশুড়ীর মেয়ে ‘প্লাবন’, একজন আধা সাহেব ও তার মা এবং আমার স্বামীর বন্ধু মতিন আকবর-এরাই মুখ্য ।ধরে নাও একশ জনের মত হবে।’
মাথা নেড়ে দোউখানু চলে গেল। একটু পর মতিবিবির প্রাণ ফাটানো চিৎকার শুনতে পেলাম। দৌঁড়ে গেলাম। আজকের মত শুয়ে থাকার জন্য যথেষ্ট হয়েছে। দোউখানুর দিকে মিষ্টি হেসে ফৌজির সাথে লাঞ্চের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম । লাঞ্চের পর টাকার কথা বলেই ফেলবো।
কোহেকাফ থেকে সদাই পাতি চলে এসেছে, ওদেরকেও তো পেমেন্ট করতে হবে।

চুরুটের গন্ধ

বছর ১২-১৪ আগের এই ঘটনা। আমরা, অর্থাৎ আমি, আমার স্ত্রী নীলা আর আমার মেয়ে রুচিকা, এক শিতের ছুটিতে বেড়াতে গিয়েছিলাম দার্জিলিং। এক সপ্তাহের ছুটি কাটিয়ে আমরা নেমে আসছিলাম শিলিগুড়ির দিকে। পাহারের কোল ঘেঁসে আমাদের গাড়ি দ্রুত নেমে চলেছে সরু পাহাড়ি রাস্তা ধরে। রাস্তার পাশে পাহারের ঢাল ধরে শালবন আর তার মধ্যে মধ্যে ছোট ছোট শহর, গ্রাম আর চা বাগানের এস্টেট। গারির নেপালি চালক বাহাদুর সিং নিপুণ হাতে আমাদের গাড়ি দুর্গম রাস্তা দিয়ে নিয়ে চলেছেন। আমরা দার্জিলিং থেকে দুপুরের খাওয়া শেরে বেরিয়েছি। পথ চলতে ঘনটার বেশি লাগবে নাবিকেল ৪টের মধ্যে শিলিগুড়িতে পৌঁছে যাওয়া উচিত।
বাহাদুরের পাশে সিটে বসে আমি পথের শোভা উপভোগ করে চলেছি। গারির ঘড়িতে তখন বাজে ৪টে।রাস্তায়ে একটু আগে দেখলাম আমাদের সামনে অন্য গারি গুল আটকে গেছে। গাড়ি থামিয়ে খোজ নিয়ে জানা গেল যে ধ্বস নেমে সামনে রাস্তা বন্ধ হয়েছে। সৈনিক বাহিনীর লোক লাগিয়ে পথ পরিষ্কার করার কাজ শুরু হয়েছে, কিন্তু ষে কাজ কতক্ষণ লাগবে কেউ তা সঠিক জানে না।বাহাদুর আর নীলার সাথে পরামর্শ করে ঠিক করলাম যে আমরা গাড়ি ঘুরিয়ে পিছনে ফেলে আশা মকাই-বারির দিকে ফিরে জাব। সেই পথে আসতে কিচ্ছু চা বাগানের বাংলো নজরে পড়েছিল। আমরা ঠিক করলাম যে আজ রাতটা চা বাগানের ডাক বাংলোয়ে কাটিয়ে পরের দিন সকাল বেলা ফের রওনা হব।
অল্প রাস্তা আবার গাড়ি চলল পাহাড় বেয়ে উপর দিকে। মকাই বারি থেকে কিছু আগে একটা ছোটো এস্টেট দেখে আমাদের গাড়ি বড় রাস্তা ছেরে কাচা রাস্তা ধরল। চা বাগানের ভিতর দিয়ে অল্প দূর এগতেই চোখে পরল কিছু অফিস বারিএকটু পৃথক একটা সুন্দর এবং বেশ পুরনো কাঠের বাংলো বাড়ি। বাংলোটা জমি থেকে অল্প উঁচুতে, যেরকম পাহাড়ি অঞ্চলের বাড়ি হয়ে। চার পাশ ঘিরে চওড়া বারান্দা রয়েছে। বারিটার মাথাতে টালির ছাদ, এক কালে হয়ত লাল রঙ ছিল, এখন অনেক জায়গাতে শ্যাওলা পরে গেছে। ছাদের মাঝা মাঝি একটা পুরনো পাথরের চিমনি উঠে গেছে, যেটা দিয়ে অল্প ধুয়ও বেরচ্ছে। বারির পেছনে একটা ছোটো বাগান দেখতে পেলাম। তার তিন ধার পাহাড়ি ঝোপ দিয়ে ঘেরা। বুঝতে অসুবিধে হয় না যে এই বাংলোটি ভালই দেখা শুনা হয়। আমরা গাড়ি থেকে নামতেই দেখলাম এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক বারির সামনের বারান্দা থেকে নেমে এসেছেন। তার সাথে আলাপ করে জানলাম তিনি এখানকার কেয়ারটেকারনাম হরিনাথ বাবু। তিনে জানালেন যে ঘরটি আপাতত খালি আছে এবং আমরা এক রাতের জন্য সেখানে থাকতে পারি। গাড়ি থেকে মালপত্র নামিয়ে আমরা বাড়িটাতে প্রবেশ করলাম। বারির ভেতরটা পুরনো ধাঁচে সাহেবি কায়দায়ে সাজানো। ঢুকে বসবার ঘর এবং খাবার ঘর দুটোই বেশ বড়। সঙ্গে লাগোয়া রান্নার ঘর আর এক পাশে দুইটা শোবার ঘর।বসবার ঘর থেকে পেছনের বারান্দায়ে বেরনোর জরা কাচের দরজা।ঘরের আসবাব পত্র দেখে বেশ অনুমান করা যায় যে এই বাড়ি যিনি বানিয়েছিলেন তিনি ছিলেন শৌখিন রুচির মানুষ।
আমরা আমাদের জিনিসপত্র শোবার ঘরে তুলে পেছনের বারান্দাতে একটা বেতের সোফা সেটে গিয়ে বসলাম।হরি বাবু চায়ের আয়োজন করেছেন। পাহাড়ি এলাকায়ে অন্ধকার চট করে পরে যায়। আমরা সেই বারান্দায়ে বসে সূর্য ডোবা দেখতে লাগলাম। সামনে ছোট্ট সুন্দর সাজানো বাগান।বাগানের চার পাশে অনেক রকম ফুলের গাছ। মাঝখানে একটা পুরনো পাথরের ফোয়ারাসেটা থেকে অনেক দিন জল বেরনো বন্ধ হয়ে গিয়েছে মনে হল। একটা সরু পাথর বাধানো পায়ে চলার পথ বারান্দা থেকে নেমে এই ফোয়ারা প্রদক্ষিণ করে বাগানের পেছন দিকে ঘুরে গেছে। বাগানের তিন দিক পাহাড়ি ঝোপ দিয়ে ঘেরা। ঝপের ওই ধারে চা বাগান শুরু। যত দূর চোখ যায় পাহারের ঢাল ধরে সবুজ চা গাছের বাগান বহু দূরে কালচে নীল তেরাই শালবনের সাথে মিশে গেছে।
চা খেয়ে আমরা বাগানের পথটা দিয়ে অল্প এগলাম। পাথরের ফোয়ারাটা পার হয়ে পথটা বেকে গেছে একটা গন্ধরাজ কাঠগোলাপ গাছের গাঁ ঘেঁষে। সেই দিক্টায়ে দেখি রুচিকা পথের ধারে দারিয়ে কিছু যেন মন দিয়ে দেখছে। কাছে গিয়ে দেখি একটা ছোটো সমাধি। সমাধিতে তিনটে কবর। প্রায় গাছগাছড়ায়ে ঢেকে গেছে। নজর করে পাথরের গায়ে খোদাই করা লেখা পরলাম।
In Memory of                        In Loving Memory of our daughter             RIP
Mary Anne Stuart               Rebbecca Stuart                                              Charles Stuart
1926 -1960                            1950-                                                                  1921-1960
বুঝতে অসুবিধে হল না, যে এরা সবাই একটা পরিবারের। বোধহয়ে বাবা, মা, মেয়েমনে প্রশ্ন জাগলরেবেকার কবরের গায়ে শুধু জন্ম তারিখটাই দেওয়া আছে কেন? মনটা খারাপ হয়ে গেল, দূর বিদেশে তাদের জীবন কাহিনীর সমাপ্তি হয়েছে অল্প সময়ের ব্যবধানে মাত্র এক বছরের মধ্যে। এক অচেনা অজানা ছায়া নেমে এলো আমার মনে। এদিকে সূর্য অস্ত গেছে পশ্চিমের পাহারের পিছনে। দিনের আল ফুরিয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আমরা আবার বাংলোর ভিতর ফিরে এলাম।
রাতের খাবারের বেশ ভালই আয়োজন করেছিলেন হরি বাবু। মুরগির ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে আমরা ফায়ার প্লেসের সামনে বসে গল্প করলাম কিছুক্ষণ। হরি-বাবুও যোগ দিলেন আমাদের সাথে। বাহাদুর সিং তার খাবার নিয়ে আগেই চলে গেছেষে রাতে গড়িতেয়ই শোবে।কিছু পরে রুচিকা একটা গল্পের বই নিয়ে নিজের ঘরে শুতে চলে গেল। রুচিকার বয়স তখন দশ। এখানে পউছন থেকে ওকে খুব চুপচাপ মনে হচ্ছে। যেন কিছু চিন্তা করছে। একটু পরে নীলা হাই তুলে উঠে পরল। নীলা যাবার পর আমি হরি-বাবুর সাথে কিছুক্ষণ গল্প করলাম। তার থেকেই জানতে পারলাম বাগানে দেখা সমাধির ইতিহাস।
দেশ স্বাধীন হবার পরেও বাগানের মালিকানা ছিল সাহেবি হাতে। ১৯৫০ শালে এই বাগানের ম্যানেজার হয়ে আসেন চার্লস স্টুয়ারট তার সঙ্গে আসেন নতুন মেমসাহেব পত্নী মেরি অ্যান। আসার এক বছরের মধ্যেই তাদের এক সন্তান হয়ে। এই বাগানেই জন্মায়ে ফুটফুটে মেয়ে রেবেকা। তার পরের কয়েক বছর খুব সুখে কাটে এই ছোট তিন জনের পরিবার। ছোট রেবেকা বেরে ওঠে ওই বাগানে। বাগানের সবাই তাকে স্নেহের চোখে দেখে। বাবা মার ষে চোখের মনি।
তবে প্রকৃতির নিয়মকোন কিছুই চির স্থায়ী নয়।এই সুন্দর সংসার এই নিয়মের গণ্ডি রেখায় সীমা বধ্য। এক দিনের ঘটনা এই ছোটো পরিবারের শান্তির পটচিত্র ছিরে দিল। রেবেকার ছিল দুরন্ত ডানপিটে স্বভাবএকাই বেরিয়ে ঘুরত চা বাগানে ঘড়ায়ে চেপে। এক দিন দুপুর বেলায়ে রজের মতো ষে ঘোড়ার পিঠে ঘুরতে বেরাল। ঘণ্টা খানেক পরে তার ঘোড়া ফিরে এল কিন্তু রেবেকা ফিরল না। সাহেব দল বল নিয়ে কানায়ে কানায়ে পাহাড় জঙ্গল তল পার করে খুঁজলেন, কিন্তু কোন লাভ হল না। রেবেকা কে আর কোন দিন কেউ খুঁজে পেল না। ওই বাগানের কনা তেই রেবেকার স্মৃতিতে একটা সমাধি বানালেন সাহেব।এই ধাক্কা মেরি-আয়ন সামাল দিতে পারলেন না। রেবেকা কে হারানর পরেই তিনি শোকে শয্যা শাই হয়ে পরলেন।ধীরে ধীরে তার অবস্থার অবনতি হতে থাকল। কলকাতা থেকে ডাক্তার আনিয়ও তাকে বাচাতে পারলেন না সাহেব। শেষ পর্যন্ত সবাই বুঝতে পেরেছিল মেমসাহেবের  কষ্ট শরীরের নয় মনের। এক দিন রাতে শুতে গিয়ে সকাল বেলা তার আর ঘুম ভাঙল না। রেবেকার সমাধির পাসেই নিজের স্থান করে নিলেন মেরি-আয়ন।
এর পরে চার্লস সাহেবের মধ্যে একটা পরিবর্তন নজর করলে সকলে। যে লকটা সবার সাথে হেসে কথা বলত, জাকে সব বন্ধু রা ভালবাসত, যাকে তার কর্মচারীরা শ্রদ্ধা করত, সেই মানুষটা রাতারাতি পাল্টে গেল। রোজ দুপুরের পর থেকেই মদ খেতে শুরু করলেন। লকজনের সঙ্গে মেলা মেশা বন্ধ করে দিলেন একদম। বাগানের লোক বারির কাজের লোকেরা দেখলও যে সাহেবের চোখে মুখে একটা কালো ছায়া নেমে এসেছে। সন্ধ্যার পর থেকে তিনে বসে থাকতে শুরু করলেন বাগানের দিকে মুখ করে পেছনের বারান্দায়ে। নিজের আর মদের গ্লাস নিয়ে নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলতেন। লোকে তাকে ভয়ে পেতে শুরু করল। এরকম বেশি দিন চলল না। একদিন ভরে গুলির আওয়াজ শুনে ছুটে বেরিয়ে এল মালী আর রান্নার লোক। তারা দেখলও সাহেব নিজের জাওয়ার সময়ে নিজেই বেছে নিয়েছেন।বারান্দায়ে তার লাশ পরে আছে। নিজের পিস্তলের গুলিতেই নিজের প্রাণ নিয়েছেন চার্লস স্টুয়ারট।
রাত দশটা নাগাত শুতে গেলাম। বাইরে অল্প বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঘরে দেখি নীলা গভীর নিদ্রায়েআমি তার পাশে কম্বল মুরি দিয়ে শুলাম। বেশ শীত, সারা দিনের খাটা খাটনির পর সহজেই ঘুমিয়ে পরলাম।
ঠিক কখন বা কেন ঘুম ভাঙল বলতে পারব না। কিন্তু একটা সময়ে আমি সজাগ। পরদার ফাঁক দিয়ে ঘরটায়ে অল্প চাদের আল ঢুকছে। বুঝতে পারলাম বৃষ্টি থেমে গেছে। পাশে টের পেলাম নীলা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আমার মনে হল যেন বসবার ঘর থেকে আমি কিছু আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। বিছানা ছেরে উঠে পরলামদরজা পেরিয়ে গেলাম বসবার ঘরে। ষে ঘর তখন নিঝুমফায়ার প্লেসের আগুন নিভে ছাই হয়ে গেছে। ঘরের ভেতরটাতে জ্যোৎস্নার আলো পরেছে। বারান্দার দরজা হাট করে খোলা। খটকা লাগলতাহলে কি শোবার আগে হরিনাথ বাবু বন্ধ করতে ভুলে গেছেন? দরজাটা বন্ধ করতে জাব, তখন দেখলাম রুচিকার ঘরের দরজাটাও ভেজান নয়। অল্প হাওয়াতে সেটা সামান্য খুলে গেছে। তার দরজা বন্ধ করতে গিয়ে আমার নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে এলো। আমি দেখলাম রুচিকার বিছানা খালি।
মুহুরতের জন্য একটা বরফের ছুরি আমার বুকটা চিরে দিল। তারপরে নিজেকে সামলে নিয়ে আমি বেরিয়ে এলাম পিছনের বারান্দায়ে। বাগানে চারিদিক নিস্তভধজ্যোৎস্নার সাদা আলোতে সব কিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ওই মাঝরাতে সেই বাংলর বাগানে আমি রুচিকাকে দেখলাম। রুচিকা বসে আছে পাথরের ফোয়ারাটার পাশে। ষে একা নয়ওর পাশে বসা ওরই বয়সী এক ছোটো মেমসাহেব কন্যা। আমার বুকের ভেতর জমা বরফটা চূর্ণ হয়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আমি ছুটে গিয়ে রুচিকাকে নিয়ে আস্তে চাইলাম, কিন্তু আমার সারা শরীর যেন অসার। টের পেলাম আমার পিছনে কেউ আছেনাকে একটা চুরুটের গন্ধ এলো। ঘুরে তাকিয়ে দেখি বারান্দার কোনায়ে বেতের চেয়ারে বসা এক সাহেব। আঙ্গুলের ফাকে চুরুট, সামনে টেবিলে মদের বোতল। স্থির চোখে আমার দিকে চেয়ে আছেন। হাতের ইশারায়ে আমায় ডাকলেন। আমি মন্ত্র মুগ্ধের মতো এগিয়ে গেলাম। বসলাম তার পাশের সাফায়।
একটু হেসে ষে বললে, “ওদের এখন ডেকো না, একটু খেলতে দাও। আমার মেয়েটা বড় একা
চুরুটের ধোয়ার গন্ধে আমার মাথা ঘুরতে থাকল। চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে গেল।
যখন আমার জ্ঞান ফিরল তখন সকাল। হরি বাবু আমাকে ঝাঁকাচ্ছেন।
আরে আপনি তো মশাই চিন্তায়ে ফেলে দিয়েছিলেনঠিক আছেন তো”? আমার তখন ঘোর কাটেনি, উত্তর দিতে পারলাম না।সারা রাত এই বারান্দায়ে কাটালেন বুঝিএরকম করে আপনার ঠাণ্ডা লেগে যাবেবেশ করা শুরে আমায়ে শোনাতে শুরু করলেন হরি বাবু।
আমার গত কাল রাতের সব কথা মনে পরে গেল। হরি বাবুকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম – “রুচিকা কথায়ে”? ছুটে গেলাম রুচিকার ঘরে, ওর ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। রুচিকা ওর বিছানায়ে সুয়ে ঘুমচ্ছে। সব কিচ্ছু মাথার ভেতর গণ্ডগোল হয়ে গেল। কাল রাতে কি আমি পুরটাই স্বপ্ন দেখেছি।
এর পর আর গল্প বিশেষ বলার নেই। বাহাদুর সিং এসে খবর দিল রাস্তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। সকালের খাওয়া সেরে, মালপত্র গারিতে তুলে আমারা যাত্রার প্রস্তুতি করছি। আম্বাসাদরের বুটে মাল ঢুকিয়ে আমি হরি বাবুর সাথে হিসাব সারছি। রশিদ  বানিয়ে দেবার সময়ে  বললেন – ” আশা করি আপনাদের বাকি যাত্রা শুভ হোক, আপনারা নিরাপদে ঘরে পউছান তার পর অল্প থেমে একবার আমার  চোখের দিকে ধীর দৃশটিতে তাকিয়ে বাকিটা – “ছোট দিদিমণি বড় মিশটিআপনারা ওকে সাম্লিয়ে রাখবেন, কারো নজর না লেগে জায়ে কথার কন জবাব দিতে পারলাম না। বাংলো থেকে বেরিয়ে গারিতে বাহাদুর সিঙ্গের পাশে বসলাম। গারি স্টার্ট দিল জলপাইগুড়ির পথে।
এই শেষ যাত্রাটুকু আমরা সকলেই চুপচাপ। পিছনে রুচিকা ওই বইটার মধ্যে ডুবে আছে। নীলা বাইরের রাস্তা দেখছে। গারি ঠিক জলপাইগুড়ি ঢোকার আগে নীলা পেছন থেকে বলল – “তুমি কি আবার সিগারেট খাওয়া শুরু করেছো ? তোমার কাল রাতের জামাতে ভীষণ চুরুটের গন্ধ পেলাম

শ্মশানের ভূত

  দ্বিতীয় পর্ব     জ্ঞান ফিরল পরদিন সকাল নটায়। ততক্ষণে ঠাকুরমশাই বাড়ির পুজো করে ফেলেছেন।       বাড়ির সবাই আমাকে চা...