আধা ঘন্টা পর বের হয়ে ডাইনিংয়ের এক কোণায় বসে রয়েছি, আর ভাবছি আর কত রাত না ঘুমিয়ে কাটাবো!মানিক জোড়ের মত আবিদ আর দোউখানুর উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ তুলে তাকিয়েছি । বুকটা ঢিপ ঢিপ করছে । মাথাটা ঠান্ডা হলেও, মুখটা বেশ গরম হয়ে উঠছে মনে হচ্ছে । মনে পড়ল ব্লাড প্রেশারের ট্যাবলেটটা খেতে ভুলে গিয়েছি। আমি ওদেরকে হাতের ইশারায় একটু অপেক্ষা করতে বলে ,একটু উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই আবিদ বলল, ‘ তুমি বস, আমি নিয়ে আসছি । ‘ দোউখানু ‘ ভাই আমার, পানি নিয়ে এসো । ‘ ট্যাবলেট আর পানি নিমেষে হাজির । খেয়ে ফেললাম তাড়াতাড়ি ।
তোমাদের দু’জনের বক্তব্য কি এক? ‘
দুই জনেই সমস্বরে বলে উঠল, ‘ না ‘
– ‘ ঠিক আছে, কে বলবে আগে ?’ আবিদ বলল, ‘আমি বলব, কারণ আমার বক্তব্য বেশ ছোট, আর দোউখানুর বক্তব্য শুনলে তোমার নার্ভ রিলাক্সেনের প্রয়োজন পড়তে পারে । ‘
– ঠিক আছে তোমার বক্তব্য পেশ করতে পার! ‘
-‘আমার সমস্যা এই এ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং সংক্রাণ্ত। গত ছয় মাস ধরে একজন ফ্ল্যাট এর উন্মাদ মালিক চরম বিশৃংখলা সৃষ্টি করছে । এবাড়ির কমন এবং ব্যাক্তিগত কর্মচারীদের ভীষণ ভাবে অপদস্থ করছে এমনকি মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে । এমন কি বাবার পরিচালনা সংক্রান্ত যোগ্যতা সমন্ধেও বিরুপ উক্তি প্রকাশ করেছে । আমি খুব অপমানিত বোধ করছি! পেশায় উনি প্রকৌশলী হলেও, উনি প্রশাসনের সাথেই যুক্ত। আর চোরের মায়ের বড় গলার মত আমাদেরই বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করছে । গতকাল উন্মাদ আমাদের গ্যারাজ দখল করেছে । অথচ মূল সম্পত্তির মালিক আমার বাবা। উন্মাদ লোকটা কথায় কথায় ‘ দুই টাকার লোক্ִ’ বলে সবাইকে সম্মোধন করে। ব্যাপারটা গ্রহণ যোগ্য নয়! আজ সন্ধ্যায় দোউখানুকে ধরেছিল । দোউখানু চুপ চাপ লোকটাকে দু’মিনিট শূন্যে ঝুলিয়ে রেখেছিল । আমি একটা পোষ্টার ফেলতে চাই! অগ্নি দৃষ্টি হানলাম দোউখানুর দিকে।
-‘দোউখানু তোমাকে বলেছি না এ ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকতে! ‘
-‘আবিদ, যা করবে,বুঝে শুনে করবে। আমি সমস্যাটা হালকা ভাবে শেষ করতে চাই । এবার দোউখানু বল। ‘
-‘আমি তাসনিয়া জাফর আর ব্লু স্কাইয়ের বাড়িতেও গিয়েছিলাম! ‘
-‘ সিলেকশন কার ছিল? ‘
– ‘ আবিদ ভাইয়ের ‘
– ‘ প্রথমে আমি তাসনিয়া জাফরের বাসায় গেলাম, দেখলাম একটা থালায় মানুষের গুর্দা সাজানো আর উনি ধ্যান মগ্ন হয়ে সামনে বসে আছেন, তবে বড়ই রূপবতী! প্রথমে ভেবেছিলাম উনি গুর্দাটা খাবেন, ভয়ে চলে আসছিলাম কিন্তু তারপর দেখলাম উনি গুর্দাটা দেখছেন আর কাগজে কিছু লিখছেন । সামনে একটা বইও খোলা । বুঝ্লাম উনি চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে লেখা পড়া করছেন । বড়ই একিনিষ্ঠ । ‘
– ‘ তারপর? ‘
-‘আমি ব্লু স্কাইয়ের কাছে যেতে চাই নাই, কিন্তু আবিদ ভাই বললেন ‘
-‘বেশ রোডিস রোডিস মনে হচ্ছে। দোউখানু আমিও যাব তোমার সাথে। কি আর করব ,আবিদ ভাইকে পিঠে নিয়ে রওয়ানা দিলাম।গিয়ে দেখি, উনি ওনার বাইকটা ঘসে মেজে চকচকে করলেন, তারপর টেস্ট রানের জন্য রাস্তায় নেমে এলেন। কত রকমের কসরত যে উনি দেখালেন!
আবিদ ভাই বললেন ‘কুল ‘।
তারপর বাসায় ফিরে এলাম।’
চোখ ছানা বড়া করে আবিদের দিকে তাকিয়ে আছি।
-‘মা, আগামিকাল আমি দোউখানুর সাথে বিশ্ব ভ্রমণে যেতে চাই।’
-‘কোনো মতেই না, রাতের বেলা গিয়েছো মেনে নিলাম, কেউ দেখেনি, কিন্তু দিনের বেলা একটা মানুষ উড়ে যাচ্ছে, সারা বিশ্বে তোলপাড় হয়ে যাবে!
আচ্ছা ফেসবুক অধ্যায় এখন ক্লোজড। টাকার জোগাড়ের কথা ভাবো!’
-‘কত কম পড়েছে তোমার?’
-‘চার লাখ’
-‘হু, বাবা এত দিতে গাই গুই করতেই পারে!’
-‘ম্যাডাম, আমি টাকা চিনি । আমার হতে পারত সন্দেশজাদী শাশুড়ী আম্মার আমলে দেখেছি। সব চাইতে বড় একটা টাকা আমাকে দেখাতে পারবেন? আর কত গুলো টাকা লাগবে? মানে সংখায় কত গুলো? ‘
একটা এক হাজারী নোট এনে দেখালাম। নিমেষে উধাও হয়ে গেল দোউখানু। মিনিট দশেকের মধ্যে ফিরে এসেছে, হাতে এক গাদা টাকা!
-‘দেখুন তো সন্দেশ আম্মু, এতে হবে কিনা?’
কয়েকটা টাকা হাতে নিলাম, দেখি দোউখানুর ছবি সাটানো নোটগুলোয়!
-‘সব তৈরী করতে পেরেছি , কিন্তু চেহারাটা কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না! তাই নিজের চেহারাটা ছেপে দিয়েছি!’
আমি আর আবিদ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছি!
-‘দোউখানু ভাই, বাবার বন্দুক থেকে সাবধান! এই বাড়িতে ফর্জারী!
তুমি তো মরবে না বন্ধু, কিন্তু আমার আর মাকে মরতেই হবে! নিশানা একদম পাকা! এখন পর্যন্ত একটা টার্গেটও মিস হয় নাই!’
আমরা তিনজনেই নিরুপায় হয়ে বসে আছি!
আবিদ বলল, ‘ঠিক আছে, আমি দু’লাখ দিতে পারব তবে একটা শর্ত আছে। ‘
-‘তুই দিবি কোথা থেকে? ‘
-‘ ছুটা কাজ করে রোজগার করেছি, সৎ উপার্জন ।’
-‘কি শর্ত বাবা? ‘
কিছ্ক্ষণ পর আবিদ বলল,’ -‘শর্ত হল, খাবারগুলো তৈরীর পর দোউখানুকে উধাও হয়ে যেতে হবে। ডিনারের সময় ও অন্য বেশে ফিরে আসবে, আমার অতিথি হয়ে।’
-‘ঠিক আছে বাবা, কিন্তু কেন?’
-‘কারণ দোউখানু আমার বন্ধু তাই।’
-‘ঠিক আছে, ঠিক আছে! বাকিটা আমি তোর বাবার কাছ থেকে ম্যানেজ করে নেব।’
-‘দোউখানুর বয়স হবে পয়্ঁত্রিশ। দেখতে হবে জর্জ ক্লুনির মত। ‘
-‘চেহারাটা একবার দেখালেই হবে, আর কাপড় জামার ধরনটা দেখিয়ে দিলেই হবে। আম্মা, আমি এখন বেরিয়ে পড়ি, সকাল হয়ে এল প্রায়, নাহলে ফিরতে দেরি হয়ে যাবে।’
-‘হু, তুমি রওয়ানা হয়ে যাও দোউখানু আর আমারও বের হতে হবে। তোমার সাথে আরও কথা আছে দোউখানু। পরে বলব।’
-‘জ্বি ম্যাডাম।’
একটু প্রসন্ন বোধ করলাম। ‘ম্যাডাম’ ডাকটা অভ্যাস হয়ে যাবে মনে হচ্ছে । যাই বেরিয়ে পড়ি শাহজাদী বিলকিস বেগমের খোঁজে।
সকাল নয়টার মধ্যে বিলকিস বেগমের তৈলচিত্র লাগানো হয়ে গিয়েছে। ফৌজী তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছে। মতিবিবি গৃহকর্তার পিছনে উকি ঝুকি মেরে দেখছে।
-‘ইয়া আল্লাহ! এটা তো আমি মিডাম!
গৃহকর্তার গম্ভীর ধমক শুনতে পেলাম।
-‘মতিবিবি! ছবিটাকে অপমান করছো তুমি!’
এদিকে ঘড়ির কাঁটা সাড়ে দশ ছুইঁ ছুইঁ। কাঁটায় কাঁটা সাড়ে নয়টায় বেরিয়ে যাওয়ার কথা । দোউখানুর ফিরে আসার সময় হয়ে গেল। এই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে দোউখানু কত ঘন্টা কাটাবে কে জানে!
-‘তোমার কি অফিসে যেতে আজ দেরি হবে?’
-‘না, আজ আসলে বিশেষ কাজ নেই। ভাবছি আজ লাঞ্চের পরই যাব।’
আর কত দিক সামাল দেই আমি!
-‘কিন্তু আজ যে আমি ভেবেছিলাম তোমার সাথে বাইরে লাঞ্চ করবো।’
-‘ওহ! ঠিক আছে তাহলে। আমি চলে যাই অফিস, তুমি লাঞ্চে চলে এসো।’
পা চলে কি চলে না, যেন অনিচ্ছায় বেরিয়ে গেলেন উনি।
ঠিক বারোটায় দোউখানু ফিরে এল। হাতের জিনিস গুলো রেখে আমার কাছে আসার পথে চোখে পড়ল ছবিটা। থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে দোউখানু। পনের মিনিট সময় দিলাম আমি দোউখানুকে । তারপর খুব কোমল স্বরে ডাকলাম, ‘পাকু মিয়া,একটু এদিকে এসো।’
জলভরা চোখে দোউখানু আমার দিকে ফিরে তাকালো। ধীর পায়ে আমার কাছে এগিয়ে এলো।
-‘ছবিটা তোমার জন্য দোউখানু! আমার বাবার বাড়িতে ছিল। আজ সকালে এনেছি।’
হে সৃষ্টিকর্তা, শঠতার জন্য আমাকে ক্ষমা কর!
-‘দোউখানু, তুমি তোমার আনাজ পাতি সামলাও মতিবিবির হাত থেকে । বিলকিস বেগমকে দেখার জন্য তো সারা রাত পড়ে রয়েছে । কাল দাওয়াত, তোমার অনেক কাজ আর মতি বিবির কোমরের ব্যাথাটাও বাড়িয়ে তোলা প্রয়োজন।’
-‘আপনি ঠিক বলেছেন ম্যাডাম, কর্তব্য আগে।’ ধরা গলায় দোউখানু জবাব দিল।
-‘ওহ, তোমাকে বলে নেই, প্রথম দাওয়াতে আমার আত্মীয় স্বজনেরা আসবেন। আমেরিকা থেকে আমার ছোট ভাই ও তার পরিবার এসেছে, আমার বড় বোন ও তার পরিবার আমার আর একজন ভাই যিনি জ্বিন হুজুর নামে পরিচিত, আমার শাশুড়ী, আমার ফুপু শাশুড়ী,ফুপু শাশুড়ীর মেয়ে ‘প্লাবন’, একজন আধা সাহেব ও তার মা এবং আমার স্বামীর বন্ধু মতিন আকবর-এরাই মুখ্য ।ধরে নাও একশ জনের মত হবে।’
মাথা নেড়ে দোউখানু চলে গেল। একটু পর মতিবিবির প্রাণ ফাটানো চিৎকার শুনতে পেলাম। দৌঁড়ে গেলাম। আজকের মত শুয়ে থাকার জন্য যথেষ্ট হয়েছে। দোউখানুর দিকে মিষ্টি হেসে ফৌজির সাথে লাঞ্চের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম । লাঞ্চের পর টাকার কথা বলেই ফেলবো।
কোহেকাফ থেকে সদাই পাতি চলে এসেছে, ওদেরকেও তো পেমেন্ট করতে হবে।
